Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার : গল্প : গরাদ

উপল মুখোপাধ্যায়

গরাদটা অনেককে আটকে রেখেছিল তবে সবাইকে নয়। সবাই গরাদে আটকে ছিল না কারণ তারা এ পাশে , ও পাশে অবাধে যেতে পারছিল। এ পাশে চলে এলে তারা ও পাশে গরাদকে দেখছিল। তবে গরাদ আটকে রেখেছিল বহু মানুষকে তারা ঘুরছে ফিরছে , খাচ্ছে দাচ্ছে আর গরাদের ওপারে যে দরকার আছে তাকে ফ্যাল ফ্যাল করে দেখছে। এই ভাবে গরাদের ওপারে অফুরন্ত মানুষকে আটকে রেখেছিল গরাদ যাদের যা যা দরকার সব গরাদের এ পাশেই রয়েছে।

একজন মহিলাকে টাইপ করতে দেখা যাচ্ছিল যিনি কাগজ দেখে দেখে টাইপ করছিলেন। সেই সব কাগজ যা থেকে দলিল তৈরি হবে আর নানা খুঁত বের করাই ওনার কাজ। কাগজ দেখা আর খুঁত বের করা হয় বলে উনি চা খাচ্ছিলেন সুলুপ সুলুপ করে। লাল্টু দেখল ওনার চা খাওয়া কারণ সে গরাদে আটকা পড়েছে, তার যা দরকার সব গরাদের ওপাশেই আছে। সে চা খাওয়া দেখল, এরপর বিস্কুট খাওয়া দেখল। বিস্কুট খাওয়া শেষ না হওয়া দেখল। সে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছল বলে পা টনটন করছিল তাই সে কোণের দিকে একটা বড় ফায়ার এক্সটিংগুইজারে ভর দিল। ভর দিলে পায়ে চাপ কম পড়ল। পেশীরা শান্ত হল। তারা কোলাহল করছিল তা বন্ধ হয়ে গেল। লাল্টু বলল,“ আঃ!” শুনে ভদ্রমহিলা ওর দিকে তাকালেন। ভদ্রমহিলা তাকানোয় লাল্টুও তাকালো। তখন ভদ্রমহিলা বললেন,“ তাকাচ্ছেন কেন?”

—— কই তাকাচ্ছি?

—— আমি দেখলাম তাকাচ্ছেন!

—— আমি টাইপ করা দেখছিলাম।

—— কেন?

—— এমনি।

—— এখানে ওতো তাকালে চলবে না।

—— কেন?

—— কাজে অসুবিধে হয়।

—— তাই।

——তাই তাই করবেন না।

—— আচ্ছা।

লাল্টু চুপ করে গিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। আরো গোটা দুই কাগজ আছে তারপর ওর কাগজটা ধরা হবে। এই ফাঁকে সে চারপাশ দেখছে। খুব ভিড় চারপাশ থিকথিক করছে লোক। লোকে লোকারণ্য হয়ে গেছে। প্রায় প্রত্যেকেই মাস্ক পরে আছে। কেউ কেউ নেই। লাল্টু নিজেকে দেখল। সে দেখল সে মাস্ক পরে নেই। তাই সে তাড়াতাড়ি মাস্ক পরে নিল, ভিড়ের মধ্যে মাস্ক পরে নিয়ে সে স্বস্তি বোধ করল। কেন সে স্বস্তি বোধ করছে এটা ভাবতে লাগল আর তখন সে বুঝল সে এক ফায়ার এক্সটিংগুইজারের ওপর বেশ বসে আছে। এবার তার ভয় পেল। সে আগুনের কথা ভাবছিল। লঞ্চের কথা ভাবছিল। জলের কথা ভাবছিল। ফায়ার এক্সটিংগুইজারের থেকে বেরনো গ্যাসের কথা ভাবছিল। চারদিকে আগুন ছড়িয়ে পড়ছে। যে যার হাত ধরে আছে সে হাত জ্বলসে জ্বলসে উঠছে। হাত আর হাত থাকছে না। হাত থেকে মাংস খসার সময় এসে পড়ছে। মাংস খসে খসে হাড় বেরিয়ে গেলে তারা আর হাত ধরাধরি করতে পারছে না। নিশ্চিত বিস্ফোরণ হচ্ছে। লঞ্চ ডুবে যাচ্ছে। জলের ওপর দিয়ে নিচ দিয়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ছে। এতো আগুনের কথা মনে হওয়ায় ফায়ার এক্সটিংগুইজারের অস্বাভাবিক বড় সিলিণ্ডারটায় বসে লাল্টু সিগারেট ধরিয়ে বসল। সিগারেট ধরালে ধোঁয়া ছাড়ে। সে গরাদের ওপারে ভদ্রমহিলার নাকে ঠেকলে উনি বললেন,“ এ কী!”

—— কী?

—— ধোঁয়া আসছে কোথা থেকে?

—— আমি সিগারেট খাচ্ছি।

—— মাস্ক পরুন।

লাল্টু মাস্ক পরে নেয়। মাস্ক পরে নিলে সিগারেট খাওয়া যায় না। সে সিগারেটটা কোথায় নেভাবে ঠিক করতে না পেরে হাতে জ্বলন্ত সিগারেট নিয়ে বসে থাকে। তার থেকে ধোঁয়া বেরতেই থাকে, বেরতেই থাকে। সে অনেক দূর ছড়িয়ে যায়, গরাদের ঠিক ওপারে বসা ভদ্রমহিলার চারপাশ ছাড়িয়ে ভেতরে একটা ছোট চেম্বারে বসা অফিসারের ঘরের ভেতর ঢুকে যায়। সেখানে তখন গান হচ্ছিল কি? না, গান হওয়ার তো কথাই নয়। কী করে গান হবে অফিসারের ঘরে, কাজের ঘরে। সেখানে তখন লাইন পড়েছিল, লোকজন লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে অফিসারের কৃপায় ছিল অথচ অফিসারের গলার আওয়াজ শোনা যায় না। খুবই মিহি আওয়াজ কি? লাল্টু তখন ফোন করছিল চন্দনাকে কারণ তার কাগজে অনেক খুঁত বের করেছে গরাদের ওপারে থাকা ভদ্রমহিলা কারণ চন্দনার বর বড় অফিসার ছিল এই অফিসে, এখন চলে গেছে।

—— শোন না কী সব খুঁত বার করেছে এরা।

—— কী?

—— কী সব বলছে। আগে তো লাগত না।

—— কী?

—— একগাদা সব কী যেন বলছে।

—— ও যখন ছিল তখন যেতে পারলে না। পই পই করে বলেছি তখন।

—— যাক গে।

এই বলতে বলতে লাল্টু মাস্ক খুলে ফেলে আবার সিগারেট খেতে আরম্ভ করায় তার বলা কথার আওয়াজ ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে গিয়ে আরো জোরে জোরে শোনাতে লাগল গরাদের বাইরে ও ভেতরের অন্দরের সব মহালে। মহা শোরগোল পড়ে যেতে থাকে। সেটা ওর কথা ও ধোঁয়ার জন্য হতে পারে আবার নাও হতে পারে। এমন আওয়াজ যে চারদিক ঝমঝম করে উঠেছে দলিল দপ্তরের কোনা কোনা নেচে উঠছে সেই আওয়াজবাজিতে। নাঃ আর কাজ করা যাচ্ছে না আওয়াজের ঠেলায়। সবাই সবাইকে জিজ্ঞেস করতে লেগেছে আওয়াজটা আসছে কোথা থেকে। তার ফলে সবাই কথা বলছে।

লাল্টু চন্দনার সঙ্গে কথা বলা চালিয়েই যেতে থাকে।

—— আগের দলিলে রাস্তার নামই ছিল না। এখন চাইছে।

—— দাও।

—— রাস্তার নামই নেই।

—— তা হয় নাকি। —— সত্যি নাম নেই।

—— যাঃ।

—— মাইরি বলছি নাম নেই।

—— সব কিছুর মতো রাস্তারও তো নাম থাকবে। হতেই পারে না।

——— পারে, পারে।

—— এত দিন হয়ে গেল রাস্তার নাম নেই?

—— না এখনও গ্রাম বলে লেখা হয়।

—— পিন কোড কত?

—— সে কলকাতারই পিনকোড।

—— কলকাতা এলাকার ভেতর অথচ বাড়ির সামনের রাস্তা নেই?

—— রাস্তা কেন থাকবে না।

—— তবে?

—— নাম নেই।

এতো অসহ্য শোরগোলে দলিল দপ্তর নেচে উঠল। লাল্টুষ দেখল গরাদের ওপার থেকে সবাই তার দিকে চেয়ে আছে। গরাদের এপারে সব কটা মাথা, সব কটা মুখ তার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে। সেটা গরম কিনা হাত দিয়ে বুঝতে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে যাচ্ছে লাল্টু আর গরাদের ওপাশ থেকে আওয়াজ ওঠে। প্রথমে তা শুনতেই পাওয়া যায় না। কিন্তু খুব মিহি ও ধারালো হওয়ায় লাল্টুর ঘাড়ের কাছটা সরু হয়ে কেটে যায় সে আওয়াজে আর সেখান থেকে বিন্দু বিন্দু বিন্দু রক্ত বেরবো বেরবো করছে। ফলত লাল্টুকে শুনতেই হয় চারপাশ ঝমঝম আওয়াজের মধ্যে। —— যা যা দরকার লাগবে বলা হয়েছে সব লাগবে। না লাগলে দলিল হবে না।

—— না লাগলে?

—— না আনলে দলিল হবে না। আর আপনার কথা বলার থাকলে গরাদের থেকে আরো দূরে গিয়ে বলুন।

—— কথা বলিনি তো।

—— ফোন করছিলেন। আর আমি সব শুনছিলাম। এমন হলে তো কাজ চলবে না।

—— কেন ম্যাডাম।

—— কাজের ঘরে আওয়াজ চলবে না।

—— সরি ম্যাডাম।

এই বলে মিহি আওয়াজ করতে করতে অফিসার তার ঘরে ঢুকে যাওয়ায় আবার তার দরজার সামনে লাইন পড়ে গেল। লাল্টু সরি বলায় লাইনে দাঁড়ানো লোকেরা খুশি হয়েছিল বলে মনে হচ্ছে কারণ তারা ওর দিকে টুকুসখানিক তাকিয়ে নিচ্ছে প্রত্যেকে। এটা লাল্টুকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে হল বলে সে কিন্তু ভালো লাগাতে শুরু করে দিয়েছে। তার আর কিছু করারও থাকছে না। সে দলিল দপ্তরে প্রথম দিন এসে একগাদা কোয়ারি খেয়ে গেছে মানে প্রশ্ন, যার উত্তর তার জানা না থাকলেও দিতেই হবে। এই উত্তরের কথা মনে মনে ভাবতে ভাবতে সে গরাদের দিকে তাকালো। আচ্ছা , এখন কি বিকেল? সে কখন এসেছিল। এত সময় কী করে কাটে লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নাকি কোন জাম্পকাট হল? বিকেলের গরাদে আলো পড়ে না, সকালের গরাদে তোড়াই আলো পড়বে। সময় কাটতে পারে তাতে গরাদের কী বা এলো গেল। সে নিশ্চিত জানে তার কাছে দরকার গচ্ছিত আছে তাই সব্বাই আসবে দরকারে। তখন শেষ বিচারে তাদের ছবি তুলে রেখে দিলেই হবে।

সুইচ টিপে ক্যামেরা সেট করা হবে। সে ক্যামেরা ছবি তুলবে তারপর ডিজিটাল সই হবে। সে সব সই আর ছবি মিলিয়ে, আধার কার্ড মেলানোর পর দলিল সম্পূর্ণ হবে। লাল্টু দলিল সম্পূর্ণ করার কাজে এসেছিল। তার কাজের শেষ এখন দূরে। অনেক উত্তর তাকে দিতেই হবে তার আগে। বাড়ির সামনের রাস্তার নাম একটা ঠিক করতেই হবে। যা হোক কিছু একটা নইলে দলিল বেরবেই না। সেটা ঠিক করার কথাই ভাবছিল লাল্টু আর হাঁটছে। দলিল দপ্তর ছাড়িয়ে অনেক হাঁটছে আর নাম ঠিক করছে। অথচ দলিল দপ্তরের ভেতরে ভেতরে ঝমঝম আওয়াজ মিহি আওয়াজে ঢেকে যাচ্ছে। সেখানে নিখুঁত সব দলিল তৈরি হতে থাকবে। সেখানে রাস্তার নাম নিয়ে ভাবার কথাই নেই সব লেখা আছে। লেখার পর লেখা সাজিয়ে বসে থাকাটাই সেখানের দস্তুর। লাল্টু বলল,“ বাঁচা গেছে। যা হোক একটা নাম দিয়ে দেব এখন। চলবে না? খুব চলবে।” গরাদ ছেড়ে বেরিয়ে আর গরাদের আওতায় আসার কথা ভাবতেই পারল না লাল্টু। তাই সে সিগারেট ধরায় আর ধোঁয়া ছাড়ে- মনে মনে।

1

Leave a Reply Cancel reply