Categories
কুলিক রোববার

কুলিক রোববার: মুক্তগদ্য: লৌহ কপাটের অন্দরে

শ্রাবণী ভট্টাচার্য্য

দৃশ্য এক
ইন্দ্রপ্রস্থে রাজধানী স্থাপনের বেশ কিছুকাল পরের কথা। খান্ডব অরণ্যে আর একটি সভা গৃহ নির্মাণ কল্পে স্থান নির্বাচন করতে বেড়িয়েছেন কৃষ্ণ,অর্জুন ও ভীম।পথি মধ্যে হঠাৎ তাদের পথ আটকে দাড়ালো এক বিকট দর্শন নিষাদ।তার সারা গায়ে মল লিপ্ত।আকন্ঠ সুরা পান করে,সে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পর্যন্ত পারছে না।চোখের সামনে রাজপুরুষ দের দেখে সন্মান জানানো তো,দূরস্থান,সরাসরি সে ভীম,অর্জুনের দিকে আঙুল তুলে বলে,তোমরাই তো সেই গুপ্ত ঘাতক,যারা আমার পত্নী আর পাঁচ ছেলেকে বারানাবত গৃহে অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে,তাদের নিমন্ত্রিত করে বহু সুখাদ্য আর সুরা পান করিয়ে বেহুঁশ করে,তারপর লাক্ষা গৃহে আগুন লাগিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলে!কি প্রমাণ করতে?পঞ্চ পাণ্ডব আর ওই তোমাদের বহু ভোগ্যা মা মরেছে এইটা প্রমাণ করার জন্য!শোনো আমি ওই নিষাদ রমণীর পতি কীলক।এই আমি তোমাদের ধ্বংস দেখার জন্য বসে রইলাম।ফুঁসে উঠে ছিলেন ভীম,অর্জুন।কিন্তু কৃষ্ণের নির্দেশে চুপ করে যান।অর্থাৎ মহাকাব্যের যুগেও অতি সাধারণ মানুষের রাজ শক্তির বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার ছিল।
দৃশ্য দুই
ইন্দ্রপ্রস্থের ব্রাম্ভন পল্লীতে অতর্কিতে ,রাতের অন্ধকারে হানা দেয় একদল তস্কর।অবাধে লুণ্ঠন চালায় সমৃদ্ধ পণ্ডিত দের ঘরে।লুণ্ঠন করে তাদের গো ধন,নিজস্ব সম্পদ।(প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির এর রাজত্বে বিদ্বান,শাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তিদের কদর ছিল,তারা রাজার কাছ থেকে পারিতোষিক পেতেন,ও রাজাকে নানান বিষয়ে সুপরামর্শ দিতেন নির্ভয়ে)।এহেন পল্লীতে লুণ্ঠন।ব্রাম্ভন গণ নিরস্ত্র।তারা বিক্ষোভে ফেটে পড়লেন। চল লেন রাজার কাছে বিচারের আশায়।তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন তাদের সন্মুখীন হলেন,ও প্রজার প্রতি রাজধর্ম পালন করতে তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে পরলেন তস্করদের সন্ধানে।এখানেও বিক্ষোভ কারীরা রাজ রোষের শিকার হয় নি,যদিও তারা রাজার বিরুদ্ধে যথেচ্ছ বিষোদগার ই করছিলো বলা যায়।
দৃশ্য তিন
কুরু পাণ্ডবদের সেই কুখ্যাত পাশা খেলার আসর।সর্বস্ব হারিয়ে যুধিষ্ঠির পণ রাখলেন ভারত সম্রাজ্ঞী দ্রৌপদীকে।হেরে গেলেন।সভাস্থ কুরু পক্ষীয় পিশাচ গণ , দুঃ শাসন ও কর্ণের প্ররোচনায় দ্বার রক্ষীকে পুনঃ পুনঃ আদেশ দিতে লাগলো দ্রৌপদী কে সভাস্থ করতে।প্রতিবাদে গর্জে উঠলো নিতান্ত ভৃত্য।সে এই কাজ করতে অসমর্থ।পঞ্চপাণ্ডব যেখানে নপুংসক এর মতো বসে ,সেখানে এক সামান্য ভৃত্যের এই প্রতিবাদ দৃষ্টি আকর্ষণ করে বৈকি!
তাহলে কি দেখা গেল ,রাজশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সেই মহাভারতের যুগেও ছিল।কিন্তু,পরিতাপের বিষয় এই যে ,আমরা প্রাচীন শাস্ত্র,মহাকাব্য ইত্যাদি বলতে কিছু নির্দিষ্ট যুক্তিহীন আচরণই বুঝি।অধিকাংশ সময় তা হয় মন্দির কেন্দ্রিক,জাত পাত,বর্ণাশ্রম ইত্যাদি নিয়ে কিছু সুবিধেমতো যুক্তি খাড়া করে দুর্বল কে নিপীড়ন,যা অশাস্ত্রীয় তো বটেই,অমানবিক ,ক্ষমার অযোগ্য।
চাণক্য র রাজধর্ম পালন সম্পর্কিত নীতি গুলি যদি আমরা একটু আলোচনা করি,তাহলেই স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে,রাজা হলেন দুর্বলের আশ্রয়।রাজকার্যে জ্ঞানী ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিবর্গের নিয়োগ রাজাকে শক্তিশালী করে।শুধু স্তাবক পরিবেষ্টিত হয়ে থাকলে রাজার উন্নতি তো হয় ই না,দেশ ও রসাতলে যায়।
উত্তর আধুনিক ভারতবর্ষে গনতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত।কিন্তু রাজতন্ত্রের সাথে এর বিশেষ তফাৎ বর্তমানে চোখে পরে না,বরং রাজতন্ত্রের কু দিক গুলোই অতি মাত্রায় প্রতিভাত হয়।গনতন্ত্রের রাজা হলেন সর্ব শক্তিধর,নিয়ন্ত্রক।তিনি বিরুদ্ধ আচরণ বরদাস্ত করেন না,সমালোচনা তো নয় ই।উমেদার,স্তাবক,পরিবেষ্টিত রাজার দেশে প্রতিবাদী জ্ঞানী,সত্যনিষ্ঠ মানুষ,কবি,শিল্পী,সাহিত্যিক ,সমাজ কর্মী তাদের ঠাই হয় গরাদের ভেতর,নানা অছিলায়।প্রতিবাদী মানেই তুমি রাষ্ট্র শত্রু। তোমা হতে ভয়,রাষ্ট্রের আপাত শান্তি পূর্ণ পরিবেশের।তুমি রাষ্ট্র শক্তির বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে দিচ্ছ,লেলিয়ে দিচ্ছ মানুষকে।তাই বাছা,তুমি যতোই বৃদ্ধ হও,অসুস্থ হও,তোমাকে বিশ্বাস নেই।আবার ফিরে যাই চানক্য র কাছে মিত্র সম্বন্ধে কি বলছেন তিনি?বলছেন যে তোমার সুখে দুঃখে তোমার পাশে থাকবে,তোমার ভুল চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে,প্রয়োজনে তোমাকে ধিকৃত করবে,সমালোচনা তো করবেই,আর কদাপি তোমার পাপ কাজের সহ চর হবে না,সেই তোমার মিত্র।কিন্তু বাস্তবে আমরা সাধারণ পাবলিক এমন মিত্র কে পছন্দ করি না।রাজা তো নয় ই।তুচ্ছাতি তুচ্ছ কারণে এখন নেমে আসে রাজ রোষ।গরাদের ভেতরে গুনী জন,যে স্তাবক নয়,সত্য ব্রত।যে আসল অর্থে দলীয় রাজনীতি নয়,দেশের হিতৈষী, ক্রান্ত দর্শি।রাজা তাকে ত্যাগ করেছেন,নির্বিচারে,বিচারের প্রহসনের নামে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছেন।আর বাইরে বলছেন উনি দেশের শত্রু।আসলে সব সমাজে,সব কালে বিদ্বান কে ভয় পায় পাপাচারী র দল।তাই এই গনতন্ত্রের আজ এমন দুর্ভোগের দিন।মৌন ব্রত অবলম্বন করেছে জনগণ,ভিক্ষা লব্ধ কিছু চালের আশায়।ভিক্ষা লব্ধ বস্তুতেই আনন্দ।প্রশ্ন ওঠে না,কেন আমি ভিক্ষা জীবি, পরান্ন ভোগী?এসব প্রশ্ন তুললেই তুমি এই বাদী,ওই বাদী।ধনিক ও বণিক শ্রেণীর স্বার্থে যখন রাষ্ট্র পরিচালিত হয়,তখন কীলকের মতো ব্রাত্য জনের প্রশ্নে,তাদের যারা তাদের প্রশ্ন করতে শেখায় তাদের ভয় পেতে শুরু করে রাষ্ট্র।তাই সভয়ে ভয়ের উৎস মুখ বন্ধ করে দিতে চায়।আর ইতিহাস স্বাক্ষী স্বেচ্ছাচারী রাজার পতন অবশ্যম্ভাবী।

ঋণ স্বীকার গজেন্দ্র কুমার মিত্র বিরচিত পাঞ্চজন্য।

1

Leave a Reply