
সাধন দাস
কুহক কথা
রাত বারোটা। টিকটক টিকটক। নিঃশব্দ চরাচর। ‘একটি বটগাছের আত্মকথা’ আত্মস্থ করছি। রচনা লেখায় পাক্কা কুড়ি নম্বর। হঠাৎ পিঠে খোঁচা। চমকে উঠলাম। ওহ, চেনা! কঞ্চি ভূত। জানলা গলিয়ে নিঃশব্দে ঢুকেছে। ধরলাম চেপে। ভূতে মানুষে টানাটানি। বাইরে খিকখিক। বদমায়েস জয়দেব!
ফিসফিসিয়ে মায়াবি ডাক দিলো- এই জ্যোস্নায় পড়া হয় নাকি! বাইরে আয়।
চার দেওয়ালের বাইরে, উফ! চন্দ্রালোকে ভেসে যায় কুহক চরাচর। – চল ধোপাঘাটের মাঠে যাই।
– চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বই পড়ে খুব খিদে পেয়ে গেছে।
– ঠিক হ্যায়। আগে হোটেলে চল, খেয়ে আসি।
– কালিয়ায় দুটো কাৎলার মাথা পড়ে আছে। আর কিস্যু নেই।
– মাথার পিকনিক হবে আজ। ঠিক আছে, তাই প্যাক করে দাও।
ধোপাঘাটের উপরেই বুড়োবট। গুঁড়ির কোটরে ভূত থাকে। থাক। পার হয়ে ঠেলে উঠলাম। দু’জন আছি! ভয় কিসের! কুহকডাকা কুহু উড়ে গেলো গাছের আড়াল ছেড়ে। শিশু কোলে মা হনুমান জায়গা ছেড়ে দিলো। সিঙ্গেল বেড সাইজের শাখা। দু’জন দুই বিপরীতে মাথায় মাথা লাগিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লাম, পায়ের উপর পা। টানটান। চোখে মুখে পাতার ঝোপেঝাড়। ফাঁকে ফোঁকে জ্যোস্নার আভা। চারপাশ ঘিরে নেমেছে কুহক বটের গুহা। এতো নিঃসঙ্গ, এতো নিঃঝুম, অন্ধকারে মিশে গেছি। মনে হচ্ছে, নিজেদের শরীরী অস্তিত্ব নেই। জিজ্ঞেস করলাম- জয়, আমরা কি ভূত? ভূতে কি মাছের মাথা খায়?
– খায় তো! রান্না করা, কাঁচা, সব খায়।
– মাছেরা মরে গেলে কি ভূত হয়? জানিস, বন্যার বছরে এই বটের কোটরে বহু মাছ মরে পচে আটকে ছিলো।
দু’জনের মাথার দু’পাশে রাখা দুটো মাছের মাথা। কে কার মাথা খায়? মানুষ মাছের, না ভূতে মাছের? গালের ভিতর খচরমচর শব্দ, কানের সুড়ঙ্গ পথে মাথার মরমে মাছের রস ছড়াচ্ছে! – কাঁটা বেছে খাচ্ছিস?
– দশটাকা দাম নিয়েছে। সবশুদ্ধ চিবিয়ে খাচ্ছি।
– আমি বেছে খাচ্ছি।
– সব শুদ্ধ খেয়ে নে। মাছের মাথা খেয়ে নাকি আমাদের ঘিলুর রাসায়নিক বদল ঘটেছিলো। তাই আমরা মানুষ হয়েছি।
– আগে কী ছিলাম?
– কী জানি? শিম্পাঞ্জি টিম্পাঞ্জি হবে হয় তো!
– বেশ কাঁটা খেয়ে নিচ্ছি। কিন্তু মানুষের পরে কী হবো?
– কী আবার ভূত। বলে, হেসে উঠলাম।
– ওর চেয়ে গাছ হওয়া ভালো। দ্যাখ, দু’জনেই পাঁচ পাঁচ টাকা সমান দিলাম। অথচ তোর মুড়োটা বড়ো। আমারটা ছোটো।
– ঠিক আছে। আমারটা নে।
– না ঠিক নেই।
– গাছ পারে। আমরা পারিনে। মাটির রস নেওয়া থেকে প্রত্যেক পাতা পর্যন্ত খাবারের সুসমানুপাতিক বন্টন।
– বটকে পায়ের নিচে রেখে মাথায় চড়ে খাচ্ছি। অথচ বটের আত্মকাহিনিটাই রপ্ত করিনি, কেবল মুখস্থই করছি।
– বট তোর মাথাটাই খেয়েছে।
-খাক, আমার দিকে জ্যোস্না কম তোর দিকে বেশি। তার বেলা?
– ওটা তো আর সংখ্যার অঙ্কে সমান ভাগ করতে পারবিনে!
