Categories
কুলিক রোববার প্রথম পাতা

কুলিক রোববার : বালকের হায়দ্রাবাদ

শৌভিক রায়

পর্ব – ২

বে-জান পাথর সব

‘অর কুছ নেহি আতা সাব। বচপন সে ইসি কো দেখা, ইসি কো জানা। লকডাউন মে ইধার বৈঠা থা। কোই নেহি আয়া। সব চলা গয়া, সেভিংস ভি। উধার মে চল রহি হুঁ। আভি হালত থোরা আচ্ছা হ্যায়। ট্রাভেলার্স আ রহে হ্যায়। আপকো দেখ কে মালুম হোতা হ্যায়, আপ ইসকো বারে মে থোড়া বহুত জানতে হো….ফির ভি বিনতি হ্যায়…সোচিয়ে আগর হো সকে তো আপকা মেহেরবানি হোগা…`

মনে মনে বললাম ঘন্টা জানি থোড়া বহুত! ওই জানা সব্বাই জানে! টুরিস্টের জ্ঞান নিয়ে কি আর ট্র্যাভেলার হওয়া যায়!!

জ্ঞান বলতে তো এটুকুই যে, বিরাট এই দুর্গের নাম এসেছে যাদব দেবতা ‘গোল্লাস’ থেকে। তবে তেলেগু শব্দ গোল্লা আর ‘কোন্ডা’ দুর্গটির নামকরণের তথ্যটিও জানি। গোল্লাঅর্থে মেষপালক আর ‘কোন্ডা` অর্থে পাহাড়। অর্থাৎ মেষপালকের পাহাড়। এগারো কিমি পরিধির দুর্গপ্রাকারের ওপাশে চোখ রেখে, একবিংশ শতকের এই আধুনিক সময়ে, দেশের অন্যতম আধুনিক শহরের সেদিনের অবস্থাটা কল্পনা করতে অবশ্য খুব একটা বেগ পেতে হয় না। তবে সে কল্পনায় সাহায্য করে ১৫ থেকে ১৮ মিটার উঁচু ৫ কিমি দীর্ঘ দেওয়াল প্রাচীর, গ্রানাইট পাথরের ৮টি প্রবেশদ্বার, ৮৭টি বুরুজ সমৃদ্ধ বিরাট এই নির্মাণ। সত্যি বলতে চোখ টেরিয়ে গেছে দুর্গে প্রবেশ করেই!

ওয়ারাঙ্গলের কাকাতীয় (কুল দেবতা কাকাতি অর্থাৎ দুর্গা থেকে বংশের এই নাম) বংশের রাজা গণপতি ১২ শতকে মাটি দিয়ে এই দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। আরও ২০০ বছর পর দুর্গ চলে যায় বাহমনি শাসকদের হাতে। ১৩৪৬ থেকে ১৫১৮ পর্যন্ত দুর্গ ছিল তাদের দখলে। অবশেষে ১৫১৮ সালে বাহমনিদের প্রতিনিধি, পারস্য থেকে আসা, সুলতান কুলি কুতুব শাহ প্রতিষ্ঠা করেন কুতুব শাহি সাম্রাজ্যের। ইতিমধ্যে দুর্গের পরিবর্তন হয়েছে। মাটির বদলে পাথরে রূপান্তরিত হয়েছে দুর্গ। দীর্ঘ ১৭০ বছরের শাসনের পর কুতুব শাহির পতন হয় ১৬৮৭ সালে। দুর্গের কর্মী আবদুল্লা খান পানি মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের জন্য এক অন্ধকার রাতে খুলে দিয়েছিলেন দুর্গের দরজা। দীর্ঘ আট মাস ধরে দুর্গ অবরোধ করে আওরঙ্গজেব যা পারেন নি, ওই এক রাতেই তা সম্ভব হয়েছিল। ‘ফতে দরওয়াজা’ দিয়ে প্রবেশ করে দুর্দান্ত মোগল সেনারা কুতুব শাহির শেষ সুলতান আবুল হাসানকে পরাজিত করেছিল ওই অতর্কিত আক্রমণে।

দক্ষিণ ভারতের গ্রানাইট পাথরের পাহাড়চূড়ায় এই দুর্গ অবশ্যই দাক্ষিণাত্যের শান। তাবড় শাসকরা এই দুর্গের দখল নিতে চেয়েছেন নানা সময়ে। আসলে সেই সময়, সারা বিশ্বে ভারত ছিল একমাত্র হীরা-উৎপাদক দেশ। আর গোলকুন্ডার কাছে থাকা কোল্লুর খনি ছিল বিখ্যাত। সেই আমলে ‘গোলকুন্ডা হীরা’ বলে পরিচিত বিখ্যাত সব হীরা ছিল গোলকুন্ডার নিজস্ব সম্পদ। শিহরণ জাগে ভাবতে যে, কোহিনুর, হোপ, দরিয়া-ই-নূর, রিজেন্ট, ড্রেসডেন গ্রিন, অরলভ, নিজাম, জ্যাকব ইত্যাদি দুনিয়া কাঁপানো হীরা সবই ছিল গোলকুন্ডার সম্পত্তি। দুর্ভাগ্য, আজ সেসবের অনেকেই অন্য রাষ্ট্রের সম্পত্তি।

কী ছিল না দুর্গে! মন্দির, মসজিদ, টার্কিশ বাথ, তোপখানা, কারাকক্ষ, নাগিনা বাগ, জেনানা মহল,হারেম মহল, তানা শাহ কি গদি বা দরবার হল, মাটির নল ও পার্সিয়ান চাকার সাহায্যে ছাদের ওপর জল তুলে ঠান্ডা রাখবার ব্যবস্থা,, দরবার হল থেকে ৮কিমি দূরের গোসা মহলে যাওয়ার সুড়ঙ্গ পথ, রামদাসের কোঠা ও বন্দিঘর, হাবসি কামান….এ বলে আমাকে দেখ, ও বলে তাকে দেখতে!

ইতিমধ্যেই বালা হিসার গেট দিয়ে প্রবেশ করে নাসের (আমাদের সেই গাইড, যার কথা শুরুতে বলেছি) ফতে দরওয়াজায় হাততালি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে সেই আওয়াজ পৌঁছে গেছে ১২৮ মিটার উঁচু দরবার হলে। আক্কানা আর মাডান্না মন্ত্রীদ্বয়ের বাড়ির পাশ দিয়ে ৩৬০টি সিঁড়ি ভেঙে টুকটুক করে পৌঁছে গেছি ৪০০ ফুট উচ্চতায়, পাহাড়ের মাথায়, ১২ খিলান যুক্ত দরবার হলে। নাসের জানিয়েছে মন্দিরের নিচে থাকা মসজিদের মিনার দেখে দেখে নির্মিত হয়েছিল জগৎবিখ্যাত চারমিনার। জনশ্রুতি দুর্গ থেকে হায়দ্রাবাদ শহরের মাঝে অবস্থিত চারমিনার যাওয়ারও সুড়ঙ্গ পথ ছিল সেকালে। দেখে নিয়েছি তখনকার অস্ত্রসম্ভারও।ইউনেস্কোর ওয়ার্লড হেরিটেজ সম্মান পেয়েছে গোলকুন্ডা ২০১০ সালে। সন্ধেবেলায় লাইট এন্ড সাউন্ড-এর আসরও বসে দুর্গে।

দুর্গের ওপর থেকে বানজারা হিলস দেখতে দেখতে নাসের একটা কথা বলেছিল-নজরিয়া আলগ হতে হ্যায় ভাইয়া। এক দিন যো শান থা আজ পাত্থর বন গয়া। যো দেখতা হ্যায় ও ইসি পাত্থর মে সব কুছ দেখতে হ্যায়। যিস কো দেখনা নেহি আতা ও কুছ ভি নেহি দিখতা, স্রিফ পাত্থর হি দেখতা !`

….চলে আসি দুর্গ থেকে। ভারতের বহু প্রান্তের দুর্গ দেখেছি। সেদিক থেকে হয়ত নতুন কিছু নয় গোলকুন্ডা। কিন্তু অস্বীকার করব না যে, গোলকুন্ডার মতো এতটা প্রভাবিত আর কেউ করতে পারেনি।

বে-জান পাথর যে এত প্রাণময় আর বাঙময় হতে পারে তা বোধহয় গোলকুন্ডা না এলে বুঝতে পারতাম না কখনই….

(ক্রমশ)

1

Leave a Reply Cancel reply