ভাস্কর ভট্টাচার্য্য
একবার মাটির দিকে তাকাও
একবার মানুষের দিকে।
এখনো রাত শেষ হয়নি,
অন্ধকার এখনো তোমার বুকের ওপর
কঠিন পাথরের মতো, তুমি নিঃশ্বাস নিতে পারছ না।
– বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
“আমি কি অপরাধ করেছি বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে, জানতে পারি?…. এই অতিমারিতে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ অনলাইনেই তো করা যেত।” গতবছর ২০২০ র ৮ই অক্টোবর রাঁচীর উপকণ্ঠের বাড়ি থেকে যখন ৮৩ বছরের বৃদ্ধ জেসুইট ফাদার স্ট্যান স্বামীকে যখন গ্রেপ্তার করা হয়, তখন বৃদ্ধ এই কথাগুলো বলেছিলেন এন আই এর দলকে।কোনো গ্রেপ্তারী পরোয়ানা ছাড়াই সন্ত্রাসবাদী তকমা দিয়ে পুলিশ গ্রেপ্তার করে আদালতে চার্জশিট দাখিলের ঠিক একদিন আগে। ২০ অক্টোবর ২০২০ তেই মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিক মেরি মার্সেল থেকেকারা দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় তীক্ষ্ণ ভাষায় ‘গণতন্ত্রের এই অসম্মানের’ বিরুদ্ধে কলম ধরলেন। প্রশ্ন করলেন, শান্তিকামী ফাদারের নিন্দনীয় গ্রেপ্তার নিয়ে। স্পষ্ট জিজ্ঞাসা ছিল, ‘দরিদ্র ও প্রতিরোধহীন(vulnerable) মানুষের সাহায্যে দাঁড়ানোই কি এই বৃদ্ধর অপরাধ। স্ট্যান স্বামীর গ্রেপ্তারের পর থেকেই আন্তর্জাতিকভাবে ধিকৃত হয়েছে এ গণতন্ত্রের এই প্রহসন। অবশেষে বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও আইন-শাসনের নিষ্ঠুরতায় তিলতিল মৃত্যু বরণ করলেন ৮৪ বছরের বৃদ্ধ পার্কিনসন রোগাক্রান্ত, প্রায় চলৎশক্তি রহিত স্ট্যান স্বামী, ইউ এ পি এর নির্মম মহিমায়। স্ট্যান স্বামীর ‘রাষ্ট্রীয় নিধন-পর্বের’ পরে কেন্দ্র সরকারের বিরোধী গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক দলই এই মৃত্যুকে রাষ্ট্রীয় হত্যা বলে বিবৃতি দিয়েছে এবং গণতন্ত্রের দানবিক প্রকাশ ইউ এ পি এর বিরোধিতা করেছেন। মানবাধিকার কর্মী গিলমোরেসহ পৃথিবীব্যাপী বহু সংবেদনশীল খ্যাত ব্যক্তিত্ব এই রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। হা গণতন্ত্র! রাহুল গান্ধী প্রকাশ্য বিবৃতিতে বলেছেন, (Stan Swami) deserved justice & humaneness. (অর্থাৎ বিচার বা মানবতা তো মানুষের কাছে অধরা, প্রহসনেরই নামান্তর)। অথচ গণতন্ত্রের প্রধান শর্ত, ব্যক্তিমানুষ ও প্রান্তবাসীর সাংবিধানিক অধিকার সুনিশ্চিত করা। স্ট্যান স্বামীর মৃত্যু বিচারব্যবস্থাকেই প্রশ্নচিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
কে ছিলেন ফাদার স্ট্যান স্বামী? তামিলনাড়ুর এক যুবক উচ্চশিক্ষা (বিদেশ থেকেও) লাভের পর যখন বোধ করলেন তাঁর মতো মিশনারিদের তামিলনাড়ুর চেয়েও বেশী প্রয়োজন ঝাড়খণ্ডের বঞ্চিত, নিষ্পেষিত আদিবাসীদের, তিনি তাঁর জীবন নিবেদন করলেন সেই আদিবাসী সম্প্রদায়ের উন্নয়নের লক্ষ্যে। যে স্থান প্রাকৃতিক সম্পদের অঢেল ভাণ্ডার, যেখানকার খনি অঞ্চল কোটি কোটি টাকার মুনাফা আহরণ করছে, সেখানকার স্থানীয় মানুষের অপরিসীম দারিদ্র্য ও বঞ্চনা তাঁকে ভাবিয়ে তুলল। তিনি উদ্বেগে প্রতিকারের উপায় ভাবলেন। তিনি তাঁদের পড়াশুনো শেখাতেন, সমষ্টিগত ভাবে বাঁচার কৌশল শেখাতেন। রপ্ত করেছিলেন আদিবাসী ভাষাও। ছিলেন এই মানুষদের হৃদয়ে অধিষ্ঠিত। কেন বিরাগভাজন হলেন রাষ্ট্রের? তিনি দেখেছিলেন, ঐ অঞ্চল জল-জঙ্গল ও প্রকৃতিক সম্পদে ভরপুর হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের জীবন নিদারুণ দারিদ্রের। নজরে এল, খনি-কর্পোরেট মিত্তাল গোষ্ঠীসহ মাফিয়ারা স্থানীয় অধিবাসীদের উচ্ছেদ করে ব্যবসায়িক ক্ষেত্র তৈরীর মহাযজ্ঞের পরিকল্পনায় লিপ্ত। ফাদার আদিবাসীদের সংগঠিত করে ‘বিস্থাপন’ (displacement) প্রতিরোধে সামিল করলেন। এর বাইরেও ‘গুরুতর অপরাধে’ তিনি সামিল ছিলেন। নব্বইয়ের দশকে সরকার কোয়েল ও কারো নদীর উপর ড্যাম তৈরীর পরিকল্পনা নেয়, যাতে ১৩২ টি গ্রাম ৫০,০০০ একর কৃষিজমি এবং ২০,০০০ একর জঙ্গল ধ্বংস হয়ে যেত। ফাদার আদিবাসীদের এর প্রতিরোধে সংঘবদ্ধ করতে সক্রিয় ভূমিকা নেন। আরও একধাপ এগিয়ে তিনি ঝাড়খণ্ডের গ্রামাঞ্চলে মিথ্যা মামলায় প্রচুর অভিযুক্ত আদিবাসীদের দ্রুত বিচার চেয়ে ঝাড়খণ্ড হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা করেন, যাতে প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। সাথে সাথেই তিনি আদিবাসীদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করেছেন – জীবন দেব, কিন্তু জমি দেব না (জান দেঙ্গে লেকিন জমিন নাহি দেঙ্গে)। সম্প্রদায়ে মাঝে সমবায়বোধ তৈরী করেছেন সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যে। গ্রামের পর গ্রামে আদিবাসীরা সংহত হয়েছেন ‘এক মুক্কি চাউল, এক রুপয়া পয়সা’ শ্লোগানে।
বিস্ময়ে প্রশ্নতাড়িত হই, গান্ধীজি আজ বেঁচে থাকলে তাঁকেও বুঝি সন্ত্রাসবাদী,উগ্রপন্থী দেগে দেওয়া হত সম্প্রদায়- উন্নয়নের ভাবনা বাস্তবায়িত করার ‘অপরাধে’। আমাদের এই ‘গণতান্ত্রিক’ রাষ্ট্রের মানবাধিকার লঙ্ঘনের দৃষ্টান্ত আন্তর্জাতিক সূচকে বেশ উপরেই স্থান। কি শ্লাঘনীয় বিষয় তাই না! আর আমরা নাগরিকরা আপাত ঢক্কানিনাদে, চটকদারিত্বে মজে থাকি, স্ট্যান স্বামীরা তাৎক্ষণিকভাবেও কদাচ নাড়া দেয়।
জর্জ ফ্লয়েডের কথা মনে পড়ে? আমেরিকার মতো বড় দাদা রাষ্ট্রও একবছরের মধ্যে জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকারীর বিচার সম্পন্ন করে শাস্তি ঘোষণা করেছে। কারণ, শক্তিশালী গণপ্রতিবাদ। আমাদের দেশে এই নাগরিক স্বর তৈরী হয় না। আমাদের সচেতন নাগরিক স্বর সীমাবদ্ধ থাকে স্থানিক, তাৎক্ষণিক বা নির্দিষ্ট বিষয়মুখী। যে দেশে রাষ্ট্রব্যবস্থা সংবিধান অতিক্রম করে প্রতিদিন মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে, সেখানে আমরা আমাদের অভ্যন্তরের ‘ভেজা বারুদ’ যদি সময়ের আঁচে সেঁকতে না পারি তবে ‘স্ট্যান স্বামী’র মৃত্যুর মতো ঘটনা অপ্রতিরোধ্যভাবে ঘটতেই থাকবে। আর সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রীয় নীতির বাণীমঞ্জরিত ফানুসের আড়ালে আরও অগণ্য হতে থাকবে, ত্রাস-স্তব্ধ হবে নাগরিক স্বর। প্রতিমুহূর্তে চেপে -আসা, শ্বাসরোধী ব্যবস্থায় তৃতীয় পরিসর সৃষ্টিকারী গণস্বরই আপৎকালীন অক্সিজেন। নতুবা, আজকের নীরবতা এই হন্তারক ব্যবস্হার পরোক্ষ সহায়ক এবং আগামীতে আমারই অম্তিমতার পথ নির্মাণ করবে।
মৃত্যু মানে কি না-পোয়ানো গহীন কোনো রাত?
মৃত্যু মানে কি অশেষ অতল খাত?
মৃত্যু মানে কি বাঁচার উল্টো পাতা?
মৃত্যু, স্মৃতির আনকোরা এক খাতা।
স্ট্যান স্বামীরা আলোর পথে চির মৃত্যুঞ্জয়,
উলঙ্গ রাজের শ্বাপদ ত্রাসের মুখোমু্খি প্রত্যয়।
