
সাধন দাস
উৎপলকুমার গুপ্ত
হেমিংওয়ে মাছ ধরতে ভালোবাসতেন, সমুদ্রে। উৎপলদা ধরতেন গেরস্থের পুকুরে। বললেন- সাধন, তোমার কাছেই তো লালদিঘি। চলো, মাছ ধরি।
ভাগীরথীর সাথে যোগ আছে লালদিঘির।
পাড়ে হ্লুদ পিটুলিগাছ। পাতা ঝরছে। নিচে, কাদা-মাটি জলে ঝিরিঝিরি ঢেউ। ছায়ারা বাতাসে আলপনা বদলাচ্ছে। কচুরিপানার সিংহাসন বানিয়ে দু’জনে বসে গেলাম মাছ ধরতে। ময়ূর পেখমের ফাৎনা, আলপনা বদলাবার তালে দুলছে। শিকারে আছি, ফাৎনার গভীরে যে মাছেরা আলপনা মেখে বেঁচে থাকে।
সন্ধ্যের শহর। আমি আর রূপা। ফুটপাতে ভীড়। দেখা হলো, পাঁচ ফুট, বেশি হলে দু’ এক ইঞ্চি; পুতুল নিঁখুত সেই সাদা ধুতি পাঞ্জাবীর মোড়কে, কাঁধে ঝোলা, উৎপলদা। শক্ত হয়ে আমরা তিনজন দাঁড়িয়ে গেলাম। নতুন আঠার গন্ধ মাখা ‘সময়’পত্রিকার একখণ্ড আমাকে দিয়ে উৎপলদা বললেন, গল্পটা সঅব ঠিক আছে।
সেই চিলতে চাঁদের হাসি, রূপার দিকে ফিরে বললেন- কাটা, বাছা, ধোয়া, তেল মশলা সব ঠিকই ছিলো- কিইনতু… ঠিক আঁচে ঠিক কষা হয়নি। মাছধরাটা শিখিয়েছি, রূপা, সাধনকে রান্নাটা শিখিয়ো। তারপর আত্মপ্রসাদী সেই হাঃ হাঃ হাসি।
ঝড়, বৃষ্টি, দুর্যোগ। খরস্রোতে, খরায় একা কাগজের নৌকা ‘সময়’ ভাসছে। পঞ্চাশ বছর…।
ততদিনে লালদিঘিকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলা হয়েছে। পিটুলিগাছকে হত্যা। মাছেরা মানুষ নয়। প্রতিবাদ করেনি। আলপনারা ভেঙে গেছে। ক্লান্তআশি বৃদ্ধ একদিন বাড়িতে এলেন। রূপা ঠিক আঁচে ঠিক কষা টুকটাক খাইয়ে পরিপাটি বিশ্রাম দিলো বিছানায়।
– সাধন একটা গল্প দিও। রূপাও দিও। বয়স হয়েছে। বিজ্ঞাপন তুলতে পারিনে।
– উৎপলদা, এবার আমাদের গল্প ছাপতে হবে না।
– মনে হচ্ছে, এটাই শেষ সংখ্যা। এটাতে তোমাদের লেখা রাখবোই। কাগজের দাম, ছাপা খরচ হু হু করে বাড়ছে।
উৎপলদা বলতে পারেননি। প্রুফ দেখার সময় শ্রদ্ধেয় হরিশংকর দত্ত টাকার কথা বললেন।
বললাম- দাদা, লেখা দিলে টাকা দিইনে। লেখা দুটো তুলে নিচ্ছি। সাধ্য মতো টাকা সাহায্য করবো।
সঙ্গে সঙ্গে উৎপলদার ফোন- সাধন, খবর্দার! লেখা দুটো থাকবেই।
ভেবেছিলাম, পত্রিকা বেরিয়ে গেলে যা পারি দিয়ে আসবো। চুরাশি বছর বয়স আমাকে ‘সময়’ দেননি।
