অভিজিৎ সাহা
গণনার দিন থেকে সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা গড়িয়ে অবশেষে গভীর রাত্রে বিহার বিধানসভা নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র আমাদের সামনে এলো। নির্বাচনী ফলাফলকে কেন্দ্র করে এত টানটান উত্তেজনা ও হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষ কবে দেখা গিয়েছে তা কিন্তু অনেক ভোট বিশ্লেষকও হলফ করে বলতে পারছিলেন না। কোভিড-১৯ সময়কালেই এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ফলত ফলপ্রকাশে বিলম্ব হয়েছে। নির্বাচনী ফলাফল থেকে দেখা যাচ্ছে যে যাবতীয় নির্বাচনী ফলাফলের পূর্বাভাসকে ভুল প্রমাণিত করে এই নিয়ে চতুর্থবার বিহারের মসনদে পুনরায় আসীন হলেন নীতিশ কুমার ও তার নেতৃত্বাধীন এন.ডি.এ জোট। যদিও সংখ্যার বিচারে বিজেপি-র আসন সংখ্যা নীতিশ কুমারের জনতা দল ইউনাইটেড থেকে বেশি। যদিও বিজেপি বলেছিল নীতিশবাবুই আমাদের বিহারের নেতা এবং এন.ডি.এ জোট ক্ষমতাতে আসলে তিনিই মুখ্যমন্ত্রী হবেন আসন সংখ্যা যাই হোক না কেনো। নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে যে বিহার বিধানসভায় মোট ২৪৩টি আসনের মধ্যে এন.ডি.এ জোট ১২৫টি আসন পেয়েছে। এই ১২৫টি আসনের মধ্যে ১১০টি আসনে লড়াই করে বিজেপি ৭৪টি আসন জয়ী হয়েছে। জনতা দল ইউনাইটেড ১১৫টি আসনে লড়াই করে ৪৩টি আসনে জয়লাভ করেছে। হিন্দুস্তান আওয়াম মোর্চা পেয়েছে ৪টি । বিকাশশীল ইনসান পার্টি ৪টি আর ধোঁয়াশা জিইয়ে রাখা রাষ্ট্রীয় লোকজনশক্তি পার্টি পেয়েছে ১টি। তবে রাষ্ট্রীয় লোকজনশক্তি পার্টি এই ১টি আসন নিয়ে কি করবে সেটা এখনো নিশ্চিত নয়। অপরদিকে রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতৃত্বাধীন মহাগঠবন্ধন মোট ১১০টি আসনে জয়লাভ করেছে। রাষ্ট্রীয় জনতা দল ১৪৪টি আসনে লড়াই করে ৭৫টি আসন জিতেছে। আর কংগ্রেস ৭০টি আসনে জয়লাভ করে ১৯টি আসনে জিতেছে। বামপন্থীরা ২৯টি আসনে লড়াই করে ১৬টি আসনে জয়লাভ করেছে। বাকি দলগুলির মধ্যে AIMIM সীমাঞ্চলে মোট ৫টি আসনে জয়লাভ করেছে। বিএসপি ১টি আসনে জিতেছে। বাকি আসনগুলিতে নির্দল প্রার্থীরা জিতেছে। এই নির্বাচনী ফলাফলকে যদি আরো একটু বিশ্লেষণ করা যায় তাহলে দেখা যাবে রাষ্ট্রীয় জনতা দল ২৩.১% ভোট ও ৭৫টি আসন পেয়ে সবথেকে বড় দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বিজেপি ১৯.৫% ভোট ও ৭৪টি আসন লাভ করে দ্বিতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে উঠে এসেছে। সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন নিয়েও রাষ্ট্রীয় জনতা দল কিন্তু সরকার গড়তে পারলো না। সার্বিকভাবে মহাগঠবন্ধনের ফলাফল আশানুরূপ হয়নি। ফলত এই বছর তাদেরকে বিধানসভাতে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে হবে।
কিন্তু কেন মহাগঠবন্ধন ব্যর্থ হল। এর কারণ অনুসন্ধান করলে যে বিষয়গুলি আমাদের সামনে উঠে আসছে সেগুলি হল-১) কংগ্রেসের আশানুরূপ ফল না করতে পারা। মোট ৭০টি আসনে লড়াই করে ১৯টি আসনে জয়লাভ জোটকে খুব স্বাভাবিক ভাবেই সংখ্যাগরিষ্ঠতাই পৌঁছাতে দিলো না। তবে এটা এককভাবে কংগ্রেসের ব্যর্থতা নয়। এর দায় সামগ্রিকভাবে জোটকেই নিতে হবে। বিজেপি যে ৭৪টি আসন জিতেছে তার বড় অংশ এসেছে কংগ্রেসকে হারিয়ে। বিজেপি ও কংগ্রেস ৩৩টি আসনে মুখোমুখি হয়েছিল এর মধ্যে বিজেপি জিতেছে ২৭টি আর কংগ্রেস ৬টি। বিজেপি-র স্ট্রাইক রেট ৮৩% আর কংগ্রেসের স্ট্রাইক রেট ১৭%। রাষ্ট্রীয় জনতা দল ও বিজেপি ৫৬টি আসনে একে অপরের মুখোমুখি হয়েছিল সেইখানে বিজেপি জিতেছে ৩৭টি আসন আর রাষ্ট্রীয় জনতা দল ১৯টি। বিজেপি-র স্ট্রাইক রেট ৬৬% আর রাস্ট্রীয় জনতা দলের ৩৪%। সুতরাং দেখা যাচ্ছে বিজেপি মোট ৭৪টি জয়ী আসনের মধ্যে ৬৪টি এখন থেকে জিতে নিয়েছে। এই ফলাফল একদিকে কংগ্রেসের সাংগঠনিক ব্যর্থতাকে যেমন তুলে ধরলো অপরদিকে বিজেপি-র সাংগঠনিক জোর ও নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা যে এখনও অনেকাংশেই বজায় রয়েছে সেটাও প্রমাণ করলো। কংগ্রেসের এই ব্যর্থতা সারা ভারতের অন্যান্য রাজ্যের উপনির্বাচনগুলির ফলাফলের ক্ষেত্রেও প্রকট হয়ে উঠেছে। অতএব শুধু কংগ্রেস নয় সামগ্রিকভাবে দেশের বিরোধী দলগুলিকে যারা কিনা গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার মতাদর্শে বিশ্বাস করে তাদেরকে বিজেপির বিরূদ্ধে লড়াই করার জন্য আরো বেশি পরিমাণে সাংগঠনিক ও মতাদর্শগত শক্তি অর্জন করতে হবে। শুধুমাত্র ভোটের ২৫দিন আগে জোট করে আর যাই হোক হয়তো বিজেপিকে হারানো যায় না। এই প্রেক্ষিতে কংগ্রেসের সর্বভারতীয়স্তরে নেতৃত্বের নির্বাচনের অক্ষমতা জনিত সংকটের বিষয়টি আবার সামনে চলে এলো। ২) এই নির্বাচনের সবথেকে উল্লেখযোগ্য দিক হল মূলত সি.পি.আই(এম.এল)-এর নেতৃত্বে বামপন্থীদের অভূতপূর্ব ও নজরকাড়া সাফল্য। মোট ২৯টি আসনে লড়াই করে ১৬টি আসনে জয়লাভ করেছে। বামপন্থীদের অর্থনৈতিক ন্যায়ের দাবি আর রাষ্ট্রীয় জনতা দলের সামাজিক ন্যায়ের দাবি বিহারের ভোট রাজনীতিকে অন্যমাত্রায় পৌঁছিয়ে দিয়েছিল। ফলত এইবারের বিহারের নির্বাচন কেবলমাত্র নির্বাচনের মধ্যে আবদ্ধ না থেকে একটি জনআন্দোলনে পরিণত হয়েছিল। নির্বাচনী ফলাফলের প্রেক্ষিতে সি.পি.আই(এম.এল)-এর সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য বলেন যে যদি কংগ্রেস ও বামপন্থীদের ৫০টি করে আসন দেওয়া হতো তাহলে হয়তো নির্বাচনী ফলাফল অন্যরকম হতে পারতো। তবে একটা নির্বাচনী ব্যর্থতা জনগণের বৈধ-ন্যায্য দাবিদাওয়াকে কোনোভাবেই অপ্রাসঙ্গিক করে দিতে পারে না। এই নির্বাচনে সঠিকভাবেই জনগণের রোজগার, আয়, সরকারি চাকরি, কর্মসংস্থানের দাবিগুলিকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল ক্ষমতাতে এলে ৫ লক্ষ স্থায়ী সরকারি চাকরি ও আরো ৫ লক্ষ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। এর ফলে হয়তো মানুষজন জাতপাত, ধর্ম, এগুলির প্রভাব থেকে হয়তো কিছুটা হলেও মুক্ত হতে পেরেছিল। দাবিগুলি যে ন্যায্য ছিল তার প্রমান পাওয়া গেল যখন এন.ডি.এ জোট বলে তাঁরাও ক্ষমতাতে এলে ১৯ লক্ষ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে। এখন বিরোধী আসনে বসে বিরোধীদের কাজ হবে এই নীতিগুলো বাস্তবায়নে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। আরোও বেশি পরিমাণে এই নীতিগুলো নিয়ে জনগণের কাছে পৌঁছিয়ে যাওয়া।
এই নির্বাচনের সব থেকে উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার হল রাষ্ট্রীয় জনতা দলের সবোর্চ্চ নেতা ও জোটের মুখ্য মন্ত্রী প্রার্থী তেজস্বী যাদব। নির্বাচন যত এগিয়ে এসেছে যুব সমাজের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা তত বৃদ্ধি পেয়েছিল। মুখ্যত তাঁকে কেন্দ্র করেই বিহারে জোট জিতে যেতে পারে এমন একটা আশার বাতাবরণ সৃষ্টি হয়েছিল। সি.পি.আই নেতা কানাইয়া কুমারও কিন্তু বিহারের যুবসমাজের মধ্যে এক বিশাল আলোড়ন ফেলেছিল। তেজস্বীর ও কানাইয়ের জুটি আরো যদি বৃহৎ আকার পেত, তারা যদি একসাথে প্রচার অভিযানে সামিল হতেন তাহলে হয়তো নির্বাচনী ফলাফল অন্যরকম হলেও হতে পারতো। কিন্তু এই নির্বাচন যেটার অভাব অনুভব করল সেটা হল লালু প্রসাদ যাদবের অনুপস্থিতি। তিনি থাকলে হয়তো বিহারের নির্বাচনের ফলাফল অন্যরকম হলেও হতে পারত।
(লেখক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক)