লক ডাউনের গুষ্টির পিন্ডি

এপ্রিল ৮,২০২০:
কোভিড ১৯ ভাইরাসের আবির্ভাবের সঙ্গে কিসের যে তুলনা করা যায় তাই ভেবে উঠতে পারলাম না। কিন্তু এর ধাক্কায় সভ্যতার ঘুম তো দূরস্থান জাগরণও ঘুচে গেছে। ১২ তারিখে ইউনিয়ন হেলথ মিনিস্ট্রির জয়েন্ট সেক্রেটারি লাভ আগরওয়াল সাংবাদিকদের প্রেস কনফারেন্সে বলেছিলেন – ভারতে ৭৪ টি পজিটিভ কেস ধরা পড়েছে তবে আতঙ্কের কোন কারণ নেই। ১৩ তারিখে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বললেন ভারত সিরিয়াসলি নিচ্ছে না বিষয়টি। আর ১৯ তারিখেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী ২২ তারিখে একদিনের জন্য, পুরো একদিনও নয় ১৪ ঘন্টার জন্য “জনতা কার্ফু” ঘোষণা করলেন। আর বললেন শেষ হলে পাঁচ মিনিট ধরে থালি বাজিয়ে যে ডাক্তার মেডিক্যাল পারসোনেল রা এমন লড়াই করছেন তাদের ধন্যবাদ জানান। মানে যে জিনিস ১২ তারিখেও সরকার বলছিল কোন চিন্তার কারণ ই নেই তার জন্যই সরকার ১৯ তারিখ বলছে ২২ তারিখ থালি বাজিয়ে ডাক্তারদের ধন্যবাদ জানাও। বিষয়টা এতটাই পরিকল্পনাহীন হঠাত গ্রহণ করা সিদ্ধান্ত ছিল যে আম জনতাও ভাবল- তাহলে ব্যাপারটা মোটেই তত ভাববার কিছু নেই। তাই তারা ১৪ ঘন্টার সংযম পালনের পরে দেশ জুড়ে নাচন কোঁদন ও থালা গ্লাস বাটি মায় গ্যাস সিলিন্ডার বাজিয়েও হই হই করে ধন্যবাদ জানাল। এতসব ফুর্তির বাতাবরণে দুজন মানুষের ভেতরে দূরত্ব রেখে ভাইরাস সংক্রমণ না ঘটানোর যে উপায় ডাক্তাররা দিয়েছিলেন সেটাই গুবলেট হয়ে গেল। এরপর ২৪ তারিখে তিনি গোটা দেশে পুরো লক ডাউন ঘোষণা করলেন তিন সপ্তাহের জন্য। তারপরের ৫ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী প্রদীপ জ্বালিয়ে লড়াইএর একতা ঘোষণা করতে বললেন। জনতা আলো জ্বালিয়ে বাজি ফাটিয়ে দেদার একতা পালন করল। কোথাও কোথাও তো দেওয়ালির রাতের মত অগ্নিকান্ডও ঘটে গেল। কিন্তু তবুও ভাইরাস মরলও না পিছুও হটল না। আমরা আম জনতা লক ডাউনে ভাইরাস হঠাতে হাত ধোব , দূরে দূরে থাকব অন্যের কাছ থেকে ইত্যাদি বিধি পালন করা ছাড়াও বাড়ি বসে আর কী কী করব সেকথা প্রধানমন্ত্রী বলে দেন নি।
হঠাত করে ছুটি পেলে সবার আনন্দ হয় কিন্তু হঠাত করে গ্রেফতার হলে কীভাবে সময় কাটবে এ ধারণা আমাদের কারো ছিল না। নিজের বাড়িতে অন্তরীণ ছিলেন সূ চি,১৯৮৯ থেকে ২০১০ পর্যন্ত দফায় দফায় ১৫ বছর। তা পেপারে পড়েছি কিন্তু গায়েও লাগে নি তলিয়েও ভাবি নি। এখন যখন গুষ্টিসুদ্ধ নিজের বাড়ি অন্তরীণ তখন পাবলিক ফাঁপরে পড়েছে। আরে ভাই এক দিন ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপ ছাড়া জীবন অচল সেখানে তিন হপ্তা শুধুই ফেসবুক হোয়া নির্ভর দিন কাটার সুযোগ পেয়েছি তাতেও সন্তুষ্ট নয়। তখন আবার তার ইচ্ছে দোকানে গিয়ে চা খাবে- “আমরা কী চা খাব না?/ খাব না আমরা চা?” কী মুশকিল! মানুষকে সুখী করাই মুশকিল। লক্ষ লক্ষ লোক যে লক ডাউনের মধ্যে চাঁটি বাটি নিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ২০০ / ৩০০/ ৪০০ মাইল হেঁটে বাড়ি ফিরছে তা দেখেও শিক্ষিত মানুষ আতঙ্কিত। “ ওরে বাবা এরা তো ভাইরাস ছড়াবে!” ৪ ঘন্টার নোটিশে আপনাকে যদি বলা হয় ফেসবুক টুইটারের নরম কোল ছেড়ে বিছানা পত্তর ট্রাঙ্ক ছেলে পিলে সব গুটিয়ে বাড়ি যাও- পারবেন যেতে? ও বাড়ি যেতে বলা হয় নি? বাড়ি থাকতে বলা হয়েছিল! বাড়ি কাকে বলে মশয়? তিন ফুট বাই পাঁচ ফুটে খুপরি যেখানে কজন গাদাগাদি করে স্রেফ রাতের ঘুমটুকুর জন্য ঢোকে সেটা বাড়ি? লক ডাউনে মালিকের কাজ বন্ধ বলে সেই আস্তানা থেকেও যখন বের করে দেওয়া হয় তখন তারা গাঁয়ের বাড়ি ফিরতে চেয়ে হাঁটবে না তো কী করবে? তাই তারা না খেয়ে মালের বোঝা মাথায় কাঁখে বয়ে, বাচ্চা কাচ্চা পরিবার নিয়ে হেঁটেছিল। আর স্বচ্ছল ভারত সেসব টিভিতে দেখে ইস কী ইল্লিটারেট বাঞ্চ অফ পিপল বলে রেগে গস গস করেছি ওরা আমাদের ভাইরাস ছড়িয়ে মারবে এভাবে। যোগী সাধুর উত্তরপ্রদেশ সরকার সেই বাঞ্চ অফ ইল্লিটারেট পিপলের গায়ে রাসায়নিক স্প্রে করে “শুদ্ধ” করে নিয়েছিল। আর নিজেরা? একদিন পাউরুটি কেনবার জন্য বেরিয়েছি, পরের দিন কাঁচা বাজার, তার পরের দিন বিস্কুট মাংস, তার পরের দিন সিগারেট… মোদ্দা কথা হল প্রতিদিন মুখে একটা কালো ন্যাকড়া গোছের মাস্ক লাগিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছি। ফেসবুক টুইটার এখনও কাজে লাগছে আমাদের। গরম গরম স্ট্যাটাস ঝাড়তে কে কে আইন কাঁচকলা দেখিয়ে লক ডাউন ভেঙ্গে রাস্তায়। নাঃ আমার কোন দোষ নেই। আমি তো দরকারে বেরিয়েছি। ওরা অদরকারে বেরোবে কেন! কিন্তু বাড়ির কাজের কিন্তু লক ডাউন নাই। আমাদের প্রত্যেক বাড়িতেই নারী শ্রমিক থাকে। আমাদের মা বোন দিদি মাসি পিসি … সব স্ত্রীলিঙ্গের মানুষ ই যে নারী শ্রমিক তাতে কোন সন্দেহ নেই। তারা অবিশ্যি লিটারেট পিপল। তাতে কী! নারী তো! তাই তারা আমৃত্যু শ্রমিক। লক ডাউনে তাদেরই তো কাজ বাড়ির সব কাজ সেরে রাখা কিন্তু খিদের সময় খাবারের যোগান যেন মসৃণ থাকে। লক ডাউনে ছেলেদের বাড়ি থাকতে হচ্ছে এটাই না কত কষ্ট, লক ডাউন মানে ভোগসুখের লক ডাউন- সেকথা টের পেয়ে আমাদের প্রাণান্ত। স্বাধীনতা ভোগ, বিনোদন পাবার সুখ যদি এভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়, আর কারণ হিসাবে আমার আপন প্রাণ বাঁচানোটাই যদি দেখানো হয়… কী মুশকিল তখন কাকে নালিশ করব আমাদের এই দুর্দশার জন্য! তাই সিরিয়ালের মত তিনবার প্রতিধ্বনি হবে প্রশ্নটি- কাকে কাকে কাকে ???

জয়া চৌধুরী, স্প্যানিশ ভাষা সাহিত্যের অনুবাদক ও শিক্ষক, কলকাতা

17